জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাহিমা আক্তারকে হয়রানি: ক্যাম্পাস রাজনীতির কোন পথে আমরা?

বিশ্ববিদ্যালয় মানেই জ্ঞানচর্চা, মতের স্বাধীনতা এবং নিরাপদ সহাবস্থান। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বারবার দেখা যাচ্ছে—এই আদর্শ জায়গাটিই রাজনৈতিক দাপট, শক্তি প্রদর্শন এবং মানবিক অবমূল্যায়নের মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাহিমা আক্তারকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাটি তারই আরেকটি দুঃখজনক উদাহরণ।

ঘটনাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

এই ঘটনাটি শুধু একজন নারীকে হয়রানির অভিযোগ নয়; এটি আমাদের ক্যাম্পাস সংস্কৃতি, ছাত্র রাজনীতি এবং ক্ষমতার ব্যবহারের নৈতিকতা—এই তিনটি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জকসু নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যে মাহিমা আক্তারকে “বহিরাগত” সন্দেহে আটকানো, জেরা করা এবং পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। তিনি নিজে এবং একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী এটিকে অপমানজনক ও হয়রানিমূলক আচরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অপরদিকে সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠন এটিকে নিরাপত্তাজনিত ও পরিচয় যাচাইয়ের বিষয় বলে দাবি করেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—

পরিচয় যাচাইয়ের নামে কি একজন নারীকে প্রকাশ্যে হেনস্তা করা যায়?

সন্দেহ হলেই কি ছাত্র সংগঠন বিচারক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিতে পারে?

নারী ও মানব মর্যাদার প্রশ্ন

একজন নারী কী পরবে, কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবে—তা তার ব্যক্তিগত অধিকার। হিজাব, নিকাব বা মাস্ককে কেন্দ্র করে সন্দেহ তৈরি হওয়া এবং সেটিকে রাজনৈতিক উত্তেজনার হাতিয়ার বানানো অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা।

এ ধরনের আচরণ কেবল একজন ব্যক্তিকেই অপমান করে না, বরং ক্যাম্পাসে থাকা অন্য নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ভয় ও অনিরাপত্তার বোধ তৈরি করে। বিশ্ববিদ্যালয় যদি নারীর জন্য নিরাপদ না হয়, তাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয় তার মৌলিক দায়িত্বেই ব্যর্থ।

ছাত্র রাজনীতি: অধিকার না দাপট?

বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা আছে—এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই রাজনীতি যদি ভিন্নমত দমন, সন্দেহের সংস্কৃতি এবং শক্তির প্রদর্শনে পরিণত হয়, তবে তা শিক্ষাঙ্গনের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।

ছাত্র সংগঠনগুলোর কাজ হওয়া উচিত—

শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা

মত প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা

প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা

কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি—অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই প্রশাসনের বিকল্প ক্ষমতা হয়ে উঠছে। মাহিমা আক্তারের ঘটনায় সেই চিত্রই আরও স্পষ্ট হয়েছে।

প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়

এই ধরনের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতেই নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপ থাকলে পরিস্থিতি এতদূর গড়াতো কি না—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

পুলিশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ক্যাম্পাসে কোনো পক্ষের অভিযোগে যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে আটক করা হলে তা ন্যায়বিচারের ধারণাকেই দুর্বল করে।

মাহিমা আক্তারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান সমস্যার প্রতিচ্ছবি। এই ঘটনার সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। দোষী যেই হোক—তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ আজ যদি আমরা নীরব থাকি, আগামীকাল এই হয়রানির শিকার হতে পারে যে কেউ।

বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচাতে হলে, আগে আমাদের মানবিকতা, ন্যায়বোধ এবং সংযমকে ফিরিয়ে আনতে হবে।